Srotoshwini started as a cultural group in 2011 that promoted the richness of Bengali culture by staging socially relevant plays, dance and music performances. While our major initiative these days is to work for the upliftment of women and children, the cultural group still takes some time out to stage at least one play each year (fundraiser). Due to the pandemic this year, we are channeling our creativity towards a digital magazine.

কোজাগোরী

বাংলা আনুষ্ঠানিক ডিজিটল পত্রিকা

– মধুবন্তী শুক্তি

আমি লক্ষ্মী| লক্ষ্মী পূর্ণিমার সকালে পৃথিবীর আলো দেখেছিলাম, তাই আমার মা ভালোবেসে এই নামে ডাকেন। পাড়া প্রতিবেশীও তাই বলে। স্কুল এর খাতায় অবশ্য অন্য নাম।
আমি লক্ষ্মী। বারো ক্লাস এর পরে আর পড়া শোনা করিনি, মানে করতে চেয়ে ছিলাম কিন্তু হয়ে ওঠেনি।

না না, অর্থনৈতিক অসুবিধা ছিল না। বাবা সরকারি চাকরিজীবী। অসুবিধা ছিল অন্য জায়গায়। সে যাক গে, সে কথা বাদ দিলাম।
স্কুল এর পথে একটা নাচের স্কুল ছিল, আসা যাওয়ার পথে জানলা দিয়ে উঁকি দিতাম, ঘুঙুর পরে আমার বয়সী রা শিখতো। ঘুঙুরের রিন রিন আমার ভিতর অদ্ভুত ঝংকার তুলতো। মা কে একদিন বললাম, ‘ মা আমি নাচ শিখবো ‘, সপাটে এক চড় মেরে মা বললেন, ‘ না ‘। মা এর চোখে কি ছিল? ঘৃণা, অসহায়তা, শঙ্কা, বুঝলাম না। তবে আমার বুকের মধ্যের সেই ঘুঙুরের রিন রিন কে আর বাজতে দিই নি। মলাট করে শিকে এ তুলে দিয়েছিলাম।
সে যাক গে, সে কথা বাদ দিলাম।
আমি লক্ষ্মী। বাবার ওষুধ অনি, বাজার করি, মা এর হাঁটুতে বাতের তেল মালিশ করি, দাদার ফাই ফরমাস…

রতন আমার ছোটবেলার বন্ধু। বয়স বাড়ার সাথে সাথে ওর প্রতি আমার টান একটু একটু করে টের পাই, বোধ হয় ও ও পায়। বাজার যাওয়া আসার পথে ওর সাথে দেখা হয়। একটু দৃষ্টি বিনিময়, হাসি বিনিময়। বাড়িতে মিথ্যে বলে রতনের সাথে বাস এ চড়ে জিয়াগঞ্জ গিয়েছিলাম চড়ক এর মেলা দেখতে। হাত ধরে ঘুরেছি, সে যে কি অদ্ভুত ভালোলাগা, বুকের মধ্যে একটা সুগন্ধি তিতির নেচে উঠে ছিল।

পরের দিন দাদা আমাকে, লক্ষ্মী কে ডেকে বলে দিলো, ‘ রতনের সাথে আর যেন না দেখা যায় আমাকে।’ অকথ্য গালি আর তার সাথে গায়ে হাত।
আমি লক্ষ্মী। মুখ বুজে মেনে নিলাম দাদার কথা আর সুগন্ধি তিতির টাকে ভাসিয়ে দিলাম চোখের জল এ।

সপ্তাহ খানেক পরে আমার আত্মজ দাদা বলে দিল আমার বাবার বাড়িতে আমার স্থান নেই। কারণ আমার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ পাড়ার লোক। ছি ছি… লক্ষ্মী আর রতন?
আবার বাদ দিলাম। বাদ দেওয়া ছাড়া কি ই আর করবো?
আমি থাকলে সেই বাড়িতে দাদা থাকবে না।
বাবা নিরুত্তর, মা এর চোখ মাটির দিকে, আমার জন্মদাত্রী।
পেরিয়ে এসেছি বেশ কিছু মাস বাড়ির স্মৃতি বয়ে।
আজ লক্ষ্মী পূর্ণিমা, আমার জন্মদিন।
কেউ জাগবে না রাত, মা বাবা দাদা কিম্বা পাড়ার লোক কিম্বা সমাজ। কেউ জাগবে না।
কারণ আমি লক্ষ্মী, লক্ষ্মীকান্ত মজুমদার।


– অর্পিতা

 

কোজাগরী  বলতে জীবন এখন আমাদের কাছে . একটা চ্যালেঞ্জ হ’য়ে দাঁড়িয়েছে |  এর মধ্যে কত পাওয়া না পাওয়াও জায়গা করে নিয়েছে – শুধু বোধহয় একটা উপলক্ষ্যর অপেক্ষা ছিলো |  এসে গেলো ‘কোভিড’ | 

এই কোভিড আর লক্ ডাউনের দুটো দিক |  নানাবিধ কাজ. খাওয়া দাওয়া , ফ্যামিলির কাছাকাছি থাকা | আবার রোজ বিকেলে ছাদে উঠে খালি রাস্তায় গাড়ী গোণা | রাস্তার মাঝবরাবর গরুদের স্বাধীনভাবে চলা দেখা , গান শোনা , এক্সারসাইজ ইত্যাদি | আবার প্রতি মূহুর্ত্তে পাঠশালা ও পাঠভবনের বাচ্ছাদের মুখ্ , কাজ, কত মজা, বন্ধুদের সাথে থাকা-… এ সব না পাওয়া কে accept ক’রে চলার মধ্যেও আরও মর্মান্তিক  খারাপ লাগা তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে | যখন কাজ হারানো মানুষগুলো রোজ হাঁটছে, ব্যাগের ওপর্ শুয়ে থাকা বাচ্ছা, বাসষ্ট্যান্ডে তালিকায় নিজের নাম খোঁজে , তখন জীবনের যুদ্ধটা বোঝা যায়। আমাদের তো মাস মাইনে আছে, ওদের তো কিছুই নেই৷ 

 কি ভাবে বাঁচবে ওরা?

এ কোজাগরী আর কত দিন?


– সুমিতা

বাংলার যেদিন “কোজাগরী লক্ষ্মী পূজো” গুজরাটে সেদিন “শারদ পুনম” । আমার মামীমা জন্মসূত্রে গুজরাটি ব্রাহ্মণ, বিবাহসুত্রে বাঙ্গালী। আমাকে বললেন “এবারে শারদ পুনম করবো চলে এসো”।
রাতের বেলা মামার বাড়ী পৌঁছে দেখি মামীমা লক্ষ্মী পুজো ও করেছে…আলপনা, নাড়ু, ঘট ,এমনকি ইংরেজি তে লেখা পাঁচালী ও… তারপর মামীমা বললেন “চলো ছাদে যাই”….


ছাদে অন্য কোনো আলো নেই। এক কোণে ভেজানো চিঁড়ে, দুধ আর মিষ্টি রাখা।
রাত যত বাড়তে থাকলো রুপোর থালার মত চাঁদ আরো ঝকঝকে, আরো বড়ো হয়ে যেন
ছাদের আলসেতে ঝুঁকে এলো, গোটা ছাদ অদ্ভুত মায়াবী আলোয় ভরে গেলো ….
ঘাগরা চোলি পরে মেয়েরা গোল হয়ে ঘুরে নাচতে থাকলেন… “শারদ পুনম নি রাত নি….চাঁদনী খিলিছে ভালি ভাত নি”…….
চাঁদ কে সাক্ষী রেখে চাঁদ এর পুজো!!…মনটা এক্কেবারে সে কেমন যেন হয়ে গেলো…..
বাংলার “কোজাগরী” আর গুজরাটের শারদ পুনম একাকার হয়ে যাবার স্মৃতি আজও মধুময়..!!!


– দিপালী

দূর্গা পূজো র খাওয়া দাওয়ার পর, বিজয়া র কোলাকুলির পর
পাঁচ দিন এর মাথায় এসে যায় লক্ষী পূজো |
আমরা কোজাগরী কথা টা লক্ষী পূজো র সঙ্গেই সব সময়ে শুনেছি।

দু দিন আগের থেকেই শুরু হয়ে যায় প্রস্তুতি
সারা বাড়ি তে ম ম করে নাড়ু ছাঁচের প্রাণ ভোলানো গন্ধ…
আসে পাশে ঘুরলে একটু চাখাও যায় – কারণ বানাতে বানাতে একটু আধটু পড়ে ও যায় মাটিতে – ঐটাই তো লাভ !

মনে পড়ে যায়…বাবা উপোস করে মা লক্ষী বসাতেন।
বড়ো ধামায় ধান…মেজো ধামায় ধান…তারপর ছোটো ধামায় ধান
তার ওপর বেনারসি পরিয়ে – সোনার হার ইত্যাদি গহনা পরিয়ে সুন্দর মা লক্ষী হোতো ।

মা জ্যেঠিমা রা আসতেন সাদা লাল পাড় শাড়ী, মাথায় সিঁদুর, কপালে টক টক এ লাল টিপ
সাধারণ গহনা…চাবির গোছা টা ঝোলে কাঁধের পরে – হাতে ফলের থালা…

এখন তো কোজাগরী হবে Zoom এ, ভাবতে পারো?
চোখের সামনে সব দেখবে…ছুঁতে পারবেনা
ফুল ধরতে যাও…রে রে করে উঠবে সবাই
আরে ছুঁয়োনা ছুঁয়োনা…কোনো virus থাকতে পারে…
ওদিকে মা জ্যেঠিমায়েরা ফল কাটতে বসেছেন – হা হা করে সবাই ছুটে আসলো –

“আরে ফল কাটবেন না দিদি
আস্ত ফল দিয়েই পূজো হবে” !
ওনারা তো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন
এ সব তো বাবার জন্মে শুনিনি – মনে মনে ভাবেন তাঁরা |

আমতা আমতা করে অনেকেই ঠাকুর মশাই র কাছে একটু গঙ্গা জল চাইলেন| ঠাকুর মশাই লাল লাল চোখে বললেন, “দাঁড়ান মাঠাকরুন রা, sanitizer দিচ্ছি” |

মা লক্ষী অনেক ক্ষন ধরে এসব আজাইড়া ব্যাপার দেখছেন – শুনছেন। উনি আর না থাকতে পেরে বল্লেন, “বন্ধ করো এই সব, আমার skin এ তো rash বেরিয়ে গেল “।


– বন্দনা

জেগে আগেও ছিলাম, এখন বুঝেছি
আমরা চোখ বুজে জেগে ছিলাম।
সত্যি এতটা চলার পর খুব দরকার পড়েছিল
কে জাগেরে এই আওয়াজ দেবার।
ছোট্ট থেকে কথাটা শুনে বড় হয়েছি
মন দিয়ে পড়ো, মন দিয়ে শোনো
মন খারাপ করোনা, কি এর মানে।
সত্যিই যখন মন দিয়ে পড়তাম,
গান গেয়ে গান গেয়ে ভেতর থেকে
যেন আনন্দ লাগত।
মন কি ভগবান? আমাদের দুঃখ আনন্দ
সবকিছুকে মিলিয়ে দেয় আবার
ছন্দপতন করে।
নিজের মন যেন চিনলাম না
আজ সময় আছে, সুযোগ আছে
চলো মনের সাথে বসে মনকে কিছু সময় দিই।


কস্তুরী

কোজাগরী – দেবীপক্ষের প্রান্তিক তিথি।  মা লক্ষীর আরাধনা প্রতি ঘরে ঘরে, সুখ , সমৃদ্ধি , সম্পদদায়িনীরূপে।  খুব চেনা ছবি |  এতটাই চেনা , যে আমাদের মনের মুকুরে তাঁর ছবিতেই আমরা ছেপে ফেলতে চাই বালিকা, কিশোরী, রমনী ,প্রৌঢ়া-মায় তাবৎ নারীকুলকে |

আচ্ছা , ‘মানুষ’ হিসেবে কেমন এই দেবী লক্ষী?  সোনার পাথরবাটির মত উপমা ? তাহ’বে i তবে ইনিই সম্ভবতঃ একমাত্র দেবী, যিনি একাধারে মা ও মেয়ে, একাধারে বিশেষ্ শ আবার বিশেষন ওl যথা- নাম, ‘লক্ষ্মী’, আবার, কি লক্ষ্মীমন্ত বউ বা একেবারে অলক্ষ্মী | Ultimate parameter.  আবার , লক্ষীছেলে…. মানে উপমায় gender bias এর বেড়া শুধু উনিই ডিঙোতে পেরেছেন।  ‘কি কার্ত্তিক ছেলে’ বা ‘কি দুর্গা মেয়ে’ –  এরকম সরাসরি সম্বোধন বড়ো একটা শোনা যায় না ৷  তিনি নিখাদ রমনীর উপমা, কিন্তু স্বভাবে চঞ্চলা –- মানে full of  contradictions and convictions. 

না. না. এই তকমাটা আমার দেওয়া নয়।  দিয়ে গেছে ” লক্ষীপুরাণ”, ১৫০০ শতকে, বলরাম দাসের লেখনীতে |

লক্ষীপুরাণ অনুযায়ী, মালক্ষী পৃর্ণিমার রাতে স্বামী জগন্নাথ ও ভাসুর বলরামের সেবা সম্পূর্ণ করে , ভক্তদের  অবস্থা দেখতে বেরিয়েছিলেন|  তখন, ‘শরীয়া’ নামে এক চন্ডালীর পূজোয় অতি তুষ্ট হয়ে তার দারিদ্রমোচন করেন। 

 উচ্চকুলোদ্ভব দেবীর এহেন সাম্যবাদী অপরাধে স্বামী ও ভাসুর তাঁকে নিজ গৃহ তথা দেউল ছেড়ে চলে যাওয়ার আদেশ দেন।  একবস্ত্রা, নিরালঙ্কারা, স্বাভিমানী মা যাওয়ার আগে অভিশাপ দেন জগন্নাথ দেব ও বলরামকে , যার ফলে তাঁদের অন্নজল সংস্থান ঘুচে যায় | দীর্ঘদিন নানা দেশে বহু অপমান ও লাঞ্ছনা সহ্য করে অবশেষে নিজেদের দোষ স্বীকার ও ক্ষমাপ্রার্থনার পর মালক্ষীর কৃপায় তাঁরা আবার নিজ নিজ দেবপদ ফিরে পান।

এ কোন মা লক্ষী, যিনি গৃহস্থালীর সঙ্গে সঙ্গে নারীর আত্মমর্যাদাকেও সমান গুরুত্ব দেন?  যিনি দেন ব্রাক্ষ্মণ ও চন্ডালের মধ্যে নিজহাতে প্রসাদ বিনিময়ের অনুজ্ঞা?  যিনি পুরুষ সমাজের সামনে অর্ধেক আকাশের দাবী তুলে ধরেন?

নাকি ইনি সেই মা , যিনি চাঁদের আলোর মতো শিক্ষা ও সচেতনতা ছড়িয়ে দেবার সঙ্গে বুকের মাঝে মজুত রাখেন বারুদের মশলাও?

তাই বুঝি শাঁখ , উলুধ্বনির সাথে দীপ জ্বালানো, আর জাগরণের নির্দেশ ?

 মা গো , শারদ পূর্ণিমার আলোর মতো সুন্দর হোক মানুষ , জাগ্রত হোক,’ হোক কোজাগর’__  এ ধরা ‘কোজাগরী’ হোক |


– দেবীশ্রী

দেবীপক্ষের শেষে চাঁদ যেদিন তার ষোলকলা পূর্ণ করে পৃথিবীর একটু কাছে সরে এসে মায়াময় আলোয় সমস্ত বিশ্বচরাচর প্লাবিত করে, সেই দিনটি কোজাগরী পূর্ণিমা বা শারদ অথবা কৌমুদী পূর্ণিমা নামে পরিচিত। বর্ষাশেষে ধান কাটার প্রারম্ভে সেদিন উপোস করে কোথাও লক্ষ্মীপূজো, কোথাও বা খোলা আকাশের নীচে সপরিবারে সবান্ধবে রাত্রি জাগরণের প্রথা প্রচলিত।

‘কোজাগরী’র অর্থ ‘কে জাগৃত’ অথবা ‘কো জাগৃত?’ আমরা কি সত্যি জেগে আছি, নাকি অহংকার, অবিদ্যা ও অজ্ঞানের অন্ধকারে নিদ্রাচ্ছন্ন রয়েছি যুগ যুগ ধরে? অজান্তেই ছুটে চলেছি সর্বনাশের পানে? জগত জুড়ে মানুষের চিন্তা ও কর্মের বিধ্বংসী প্রতিক্রিয়া তো জানিয়ে দিচ্ছে কী ভীষণ দেরী হয়ে গেছে। পারবো কি এই ভয়ংকর সুপ্তির অবস্থা থেকে নিজেদের জাগরিত করতে? পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এমন পৃথিবী রেখে যেতে পারবো যেখানে তারা নির্ভয়ে বুক ভরে নি:শ্বাস নিতে পারবে? যেখানে বেঁচে থাকার মূলমন্ত্র হবে মৈত্রী ও ভালবাসা?
এই অদ্ভূত বছরের কার্তিক মাসের কোজাগরীর দিন, প্রশ্ন জাগছে…কবে এবং কেমন করে আসবে সেই জাগরণ?


– অনিশা

দেশে যে প্রতিদিন ৮৮ টা মেয়ের ধর্ষন হচ্ছে
তাতে কি আপনার কিচ্ছু এসে যায়?
আম্ফান নামক সাইক্লোনটি এসে যে বাংলাকে
একেবারে তছনছ করে দিয়েছে
মশাই তাতে কি আপনার কিচ্ছু এসে যায়?
দেশ জুড়ে ধর্মের লড়াই…

মানুষ মরছে আর মারছে !
আপনি তো বাপু দিব্যি অফিস ফেরৎ রোজ
চাইনিজ খাচ্ছেন রাস্তার ধারে পা দুলিয়ে বসে,
মন্ত্রী ষড়যন্ত্রী মশাইরা গরিব চাষীদের ওপর
চাপ দিয়ে তাদের ফলানো ফসল বিক্রি করছে
চড়া দামে,
আর তাদের ঘরেই তেল নুন নেই
তাই ‘ কৃষকের মৃত্যু গলায় দড়ি দিয়ে ‘ মত খবর আপনি শুনছেন ABP নিউজে,
গ্রীন টিয়ে চুমুক দিতে দিতে …
মশাই সত্যি কি কিচ্ছু এসে যায় না?
এই যে সেদিন একদল বাচ্চা বিক্রি হয়ে গেল
নিখোঁজের পোস্টার পড়ল দেয়ালে দেয়ালে,
আর…

আপনি যেন দেখতেই পাননি এমন ভাব করে
দেয়ালের ঠিক সেইখান টাতেই পানের পিকটা
ফেললেন!
আরও আছে
আরও আছে
আপনার বাড়িতে কাজ করতে আসে যে
মঞ্জু, বন্দনা আর কাকলীরা,
তার বর গত রাতে তাকে মদ্যপ অবস্থায় দেদার পিটিয়েছে-
কাঁদছে, ফোঁপাচ্ছে, আর আপনাকে লুকোনো কালশিটের দাগ গুলি দেখিয়ে আশা করছে
খানিকটা সহমর্মিতার-
আপনি কিন্তু উদাসীন গলায় তাকে তেলচিটে কড়াই টা ভাল করে মাজতে বলছেন…
আচ্ছা! ভারী অমানবিক তো আপনি!?
‘পাশে দাঁড়ানো’ , ‘সহানুভূতি’ এই শব্দ গুলো কি আপনার শব্দকোষে নেই?!
সত্যি কিচ্ছু এসে যায়না আপনার
কিচ্ছু এসে যায়না।

তারপর এই যে ধরুন পাশের বাড়ির মধুমিতা কেরোসিন ঢালল, গায়ে আগুন লাগাল…
আপনি জানতেন ওর বয়ফ্রেন্ডের সাথে মন কষাকষি চলছে বহুদিন ধরে-
তবুও আপনি গসিপে গলা মেলাচ্ছেন ‘ চরিত্র খারাপ ‘ এই বলে।
আসলে ঠিক কিচ্ছু এসে যায় না মশাই, কিচ্ছু এসে যায়না।
covid এর লকডাউনে অসংখ্য মানুষ পায়ে হেঁটেছে যোজন ক্রোশ ঘরে ফেরার তাড়নায়!
লক্ষ লক্ষ লোক একটা চাকরির খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরছে
আর … আর এই যে আমি তখন থেকে এই লম্বা লিস্ট আপনাকে শুনিয়ে যাচ্ছি…
তাতে আপনার কিচ্ছু এসে যায় না !
উত্তরে যুক্তি দেবেন “সবার জীবনেই লড়াই আছে । আর সকলকে সেই লড়াই একাই লড়তে হয়! তাতে আদতে কারোর ই কিচ্ছু এসে যায় না”

আমার কথা গুলো শুনে আপনাদের কারোর যদি টনক নড়ে,
তবে আসুন জেগে থাকি
হাতে হাত দিয়ে জেগে থাকি
জেগে থাকি প্রদীপ জ্বালিয়ে
জেগে থাকি শঙ্খ বাজিয়ে
নিরবে কিমবা সরবে…
আজ আমাদের কোজাগোরী
জেগে থাকি চলুন একসাথে !
এসে যায় মশাই এসে যায় ।
আমার দুঃখে আপনার আর আপনার দুঃখে ॥


– যূঁই

কোজাগরী স্রোতস্বিনী নাকি স্রোতস্বিনীর কোজাগরী? কোনটা আমার মনের কাছের ?

শব্দটা শুনলেই দোল পূর্ণিমার নিশি নির্মল আকাশ মনে করে মনের মধ্যে মন্দ মন্দ বাতাস বইতে থাকে । একেবারেই নস্টালজিয়া । মা এর পাঁচালি পড়া, ছোট্ট একটা ঠাকুর ঘর। সেখানে রামঠাকুর, প্রণবানন্দস্বামীজী, লক্ষ্মীর ঘট ও সিঁদুর লাগানো ফটো… তার পাশেই সন্তোষী মাতার বরাভয় । লোকনাথ বাবার সেই রণে বনে জঙ্গলে স্মরণ করার অভয়বাণী। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান |

এমনই বোধকরি অনেকের ছোটবেলার ঠাকুর ঘর ।সেই ঠাকুর ঘরের লক্ষ্মীকে পুজো করা ছিল মায়ের কোজাগরী ।

আমার ভেন্ন পথ । আমার পুজোয় ফুল বেলপাতা পাঁচালী নেই, তবে মা এর থেকে শেখা একাগ্রতা আছে । আমার পুজোয় অনেক ঠাকুরের মেলার ঠাকুরঘর নেই, কিন্তু মা এর কাছ থেকে শেখা বসুধৈব কুটুম্বকম আছে । আমার পুজোয় কোষাকুষি নেই তবে মা এর থেকেই শেখা ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু’ আছে… খুব বেশি করেই আছে । বিশ্বাস কে মূলধন করেই আজও আমার কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো।

সেদিন বন্ধু বলল , কোজাগরীর অর্থ ‘ কে জাগো রে? ‘ আমার সত্যিই জানা ছিল না ।

রাতের বেলা তাইকি ঠাকুর ঘরে একটা প্রদীপ জ্বালান থাকত? মা বলতেন, ‘লক্ষ্মী আসবেন তাই প্রদীপ জ্বালান থাক’ ।
তার মানে যাঁরা জেগে থাকেন তাদের ঘরে লক্ষ্মী আসেন ।

কি ধরণের জাগরণ মা লক্ষ্মীর পছন্দ জানা নেই। ‘আঁখি হতে ঘুম হরণ’ করে নেওয়া জাগরণ , যেথায় আঁখি পিপাসিত হয় কারো দেখা না পাওয়ার তরে? নাকি পেটের খিদে নিয়ে যারা দু চোখ এক করতে পারেনা তাদের জাগরণে? নাকি চিয়ার্স বলে কাচের গ্লাসে মিষ্টি শব্দের ঠোকা ঠুকিতে হাল্কা পিয়ানোর জাগরণে? নাকি covid 19 এ চিকিত্সারত ডাক্তারদের জাগরণে? নাকি সন্তানের মাথায় জলপট্টি দেওয়া সেই মায়ের জাগরণে? ঠিক জানা নেই । হয়ত এই সব জাগরণের পিছনে কোন এক বা একাধিক লক্ষ্মীর আগমণ হয় চুপিসারে … বড় জানতে ইচ্ছে হয় ।